পরিস্থিতি অনুকূল থাকার জন্য ৩১ মে কেরলে প্রবেশ করতে চলেছে মৌসুমী বায়ু। মৌসুমী বায়ু কথাটি এসেছে মনসিন থেকে তার অর্থ হলো ঋতু। একটি বিশেষ সময়ে এই বায়ুপ্রবাহ দেখা যায়। সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু। এই মৌসুমী বায়ুর সক্রিয় থাকার সময়কে বলা হয় বর্ষা। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বিদায় নিতে শুরু করে এবং অক্টোবরের মাঝামাঝি সমগ্র ভারত থেকে বিদায় নেয় দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু।
👉 মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তি:
সাধারণত মৌসুমী বায়ু নির্ভর করে থাকে সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের উপর। মার্চ মাস থেকে সূর্য উত্তর গোলার্ধের উপর লম্বভাবে কিরণ দিতে শুরু করে। এবং মার্চ মাস থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এপ্রিল ও মে মাসে উত্তাপ চরম পর্যায়ে উঠে যায়। যার জন্য ভারত, পাকিস্তান ও তিব্বতের উপর নিম্নচাপ ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়ে থাকে। অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল শুরু হবার জন্য বৃহৎ উচ্চচাপ তৈরি হয়ে থাকে। দক্ষিণ গোলার্ধে মাদাগাস্কার ও সোমালিয়ার কাছে উচ্চচাপ সক্রিয় হয়। অন্যদিকে অষ্ট্রেলিয়ার কাছে উচ্চচাপ তৈরি হয়। এই উচ্চচাপের প্রভাবে প্রচুর পরিমাণে বাতাস নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে ছুটে আসে। এবং বায়ুপ্রবাহের অভিমুখ বরাবর উত্তর ভারত মহাসাগরে দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে একধরনের জলস্রোত তৈরি হয় তাকে মৌসুমী বায়ু বলা হয় এবং বায়ুপ্রবাহকে বলা হয়ে থাকে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু।
🌑 সোমালিয়ান জেট :
সাধারণত মৌসুমী বায়ুর আগমনের সময় বা কিছু আগে থেকে মাদাগাস্কার ও সোমালিয়ার উপকূল সংলগ্ন পশ্চিম ভারত মহাসাগরে উচ্চচাপ তৈরি হয়। এবং এই উচ্চচাপ ৮৫০ এইচ পি এ তে ( নিম্ন বায়ুমণ্ডলীয় স্তরে) এক ধরনের পশ্চিম দক্ষিণ পশ্চিম থেকে পূর্ব উত্তর পূর্ব দিকে ভারতের দিকে শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ তৈরি করে থাকে যাকে সোমালিয়ান জেট স্ট্রিম বলা হয়ে থাকে। মে জুন মাস করে এই বায়ু কিছুটা নীচের দিকে থাকে। মৌসুমী বায়ু প্রবেশের পর জুলাই মাস থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী হয় জেটস্ট্রিম। এই জেট স্ট্রিম দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ুকে ভারতে প্রবেশ করাতে এবং ভারতের পশ্চিম উপকূল সহ মধ্যভারত, দক্ষিণ ভারতে প্রচুর বৃষ্টি ঘটাতে এবং উত্তাল সমুদ্র সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ তৈরি হলে সোমালিয়ার জেট বায়ুকে টেনে নিয়ে শক্তিশালী হতে পারে এবং প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি ঘটায়।
🔵 মনসুন ট্রাফ : বিস্তীর্ণ এলাকায় মৌসুমী বায়ু ভারতে প্রবেশ করলে বায়ুর চাপ কমে যায়। ITCZ অঞ্চল সর্বাধিক উচ্চতায় উঠে আসে জুলাই আগষ্ট মাসে। মৌসুমী বায়ু সামগ্রিক ভারতে প্রবেশ করার পর রাজস্থান/পূর্ব পাকিস্তান / পাঞ্জাব থেকে মধ্যভারত হয়ে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে উত্তর পূর্ব বা পূর্ব মধ্য বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে একপ্রকার সুদীর্ঘ আইসোবারিক অক্ষরেখা যাকে মৌসুমী অক্ষরেখা বলা হয়ে থাকে। এই অক্ষরেখা স্থায়ী অক্ষরেখা। এবং কোনো ঘূর্ণাবর্ত যদি মৌসুমী অক্ষরেখার সঙ্গে সংযুক্ত হয় তাহলে সেই অঞ্চল ও সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হয়ে থাকে। এবং কোনো কোনো সময় এই অক্ষরেখা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক উপরে উঠে আসে তার জন্য হিমালয় পাদদেশীয় অঞ্চলে প্রচুর ঝড়বৃষ্টি হয়ে থাকে। সেপ্টেম্বর মাসে মৌসুমী অক্ষরেখা দুর্বল হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
🌀 মৌসুমী নিম্নচাপ: ভারতে মৌসুমী বায়ু প্রবেশের পর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ঘনঘন নিম্নচাপ তৈরি হয়ে থাকে। আন্ত ক্রান্তীয় অভিসৃতি অঞ্চল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উপরে উঠে আসার জন্য উত্তর বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। তবে এই সময় বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে উইণ্ড শেয়ার বেশি থাকার জন্য শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়না। কেবল নিম্নচাপ তৈরি হয়। এবং বর্ষাকালে স্থল নিম্নচাপের প্রবণতা বেড়ে যায়। এগুলি পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় প্রচুর বৃষ্টি ঘটাতে সক্ষম হয়।
🌑 ইস্টার্লি ওয়েভ : ভারতে মৌসুমী বায়ু বিস্তারের পর মধ্য ও উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় স্তরে পূবালী বাতাসের তীব্রতা বাড়তে থাকে। এমনি সময়ে পশ্চিমা বাতাসের তীব্রতা বাড়লেও বর্ষাকালে পূবালী বাতাসের তীব্রতা বাড়ে। তার জন্য মেঘপুঞ্জ পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যায়। ইস্টার্লি ওয়েভ ও মৌসুমী অক্ষরেখা অনুসরণ করে পশ্চিম উত্তর পশ্চিম/ পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয় নিম্নচাপ। কোনো কোনো সময় পূবালী বাতাস অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার জন্য নিম্নচাপের মেঘপুঞ্জ পশ্চিম দিকে হেলে থাকে। তার জন্য ওড়িশা ও মধ্যভারতে প্রচুর বৃষ্টি হয় । অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় এলাকা এই কারণেই বৃষ্টি থেকে কোনো কোনো সময় বঞ্চিত হয়।
🔵 জলবায়ুগত বৃহত্তর নিয়ন্ত্রক :
জলবায়ুগত বৃহত্তর নিয়ন্ত্রক হলো এলনিনো, লা নিনা ও আই ও ডি। সাধারণত এলনিনো থাকাকালীন পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর অত্যধিক সক্রিয় থাকে তার জন্য পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগর তুলনায় কম সক্রিয় থাকে। যার জন্য মৌসুমী বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়ে থাকে। অন্যদিকে এনসো নিউট্রাল থাকলে মৌসুমী বায়ু সমগ্র দেশে স্বাভাবিক হারে বৃষ্টি ঘটায়। অন্যদিকে লা নিনা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অতি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে পূর্ব ভারত , মধ্য ভারত ও উত্তর পূর্ব ভারতে অতি মাত্রায় বৃষ্টি হয়ে থাকে। অন্যদিকে এল নিনো ও আই ও ডি যুগ্ম ভাবে ভারতের বৃষ্টির বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। লা নিনা মোদকী, লা নিনা পরিস্থিতির পাশাপাশি আই ও ডি নিরপেক্ষ থাকলে পশ্চিমবঙ্গে , মধ্যভারত ও উত্তর পূর্ব ভারতে প্রচুর বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে এনসো ৩.৪ ইনডেক্স ০ রয়েছে। মে মাসের ২ তারিখ এনসো -০.২ ছিল। অর্থাৎ পুরোপুরি এনসো ৩.৪ সূচক নিরপেক্ষ রয়েছে। আগামী জুলাই মাসে -০.১ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এবং অক্টোবর মাসে -০.৩ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ এনসো ইনডেক্স যা রয়েছে তাতে ২০২১ সালে ভালোই বর্ষার ইঙ্গিত দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। অর্থাৎ এবছর আগামী দিনে লা নিনা মোদকী হবার সম্ভাবনা রয়েছে যার জন্য সারা ভারতে স্বাভাবিক বর্ষা হবে ও আগষ্ট মাস থেকে অক্টোবরের মধ্যে লা নিনার দিকে এনসো অগ্রসর হবার জন্য পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়বে। অন্যদিকে আই ও ডি ইনডেক্স বর্তমানে -০.৪৬°সে রয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে -০.৬-০.৮°সে আশেপাশে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যার জন্য জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড , মধ্যভারত, ছত্তিশগড়, ওড়িশা ও উত্তর পূর্ব ভারতে প্রচুর বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টিপাত ভালো হবে বাংলাদেশে। আগামী দিনে আই ও ডি সূচক কমার জন্য ও নিউট্রাল বা লা নিনার দিকে কিছুটা হেলে থাকা এনসোর জন্য বঙ্গোপসাগরে ঘনঘন নিম্নচাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে আগামী দিনে ২০২১ সালে জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে। জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসে নিম্নচাপের সম্ভাবনা বাড়বে।
👉 এম জে ও : ম্যাডেন জুলিয়ান অশিলেশন বর্তমানে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। আগামী দিনে ফেজ ৬-৮ এর দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যার জন্য আরবসাগর ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল আগামী ৭ দিনে ক্রান্তীয় ঝঞ্ঝা তেমন একটা তৈরির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু জুন মাসের ১০ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে এম জে ও ফেজ ২ ও ৩ এ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই জুন মাসের ১০-১৭ তারিখের মধ্যে বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় নিম্নচাপের সম্ভাবনা রয়েছে। মা আগামী দিনে শক্তিশালী হয়ে সুষ্পষ্ট নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ বা অতি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হলেও হতে পারে। তবে আদৌ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হবে কিনা তা এখনি বলা সম্ভব নয়। তাই অযথা আতঙ্কিত হবেননা।
👉 মৌসুমী বায়ুর বর্তমান অবস্থান : মৌসুমী বায়ু বর্তমানে লক্ষ দ্বীপ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা হয়ে পূর্ব মধ্য বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। আগামী ৭২-৯৬ ঘন্টার মধ্যে তা কেরালা সহ দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু যায়গায় প্রবেশ করতে পারে। ৬/৭ জুনের মধ্যে মহারাষ্ট্র ও মুম্বাইয়ে মৌসুমী বায়ু প্রবেশ করতে পারে এছাড়া দক্ষিণ ভারতের আরো বেশ কিছু যায়গায় প্রবেশ করতে পারে। ৭-১৪ তারিখের মধ্যে মৌসুমী বায়ু উত্তর পূর্ব ভারতের বেশ কিছু যায়গায় ও উত্তরবঙ্গে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হলে ১০-১৭ জুনের মধ্যে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গে মৌসুমী বায়ু প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
⛈️ আসন্ন আবহাওয়া পরিস্থিতি: আগামী ৭২-৯৬ ঘন্টায় দক্ষিণবঙ্গে অসস্তিকর ঘর্মাক্ত গরম অনুভব হবে। আকাশ থাকবে আংশিক থেকে কোনো কোনো সময় প্রধানত মেঘাছন্ন। কিছু কিছু যায়গায় বিক্ষিপ্ত ভাবে বজ্রবিদ্যুত সহ ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে ৭২-৯৬ ঘন্টায় বিক্ষিপ্ত বজ্রবিদ্যুৎ সহ ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতের সতর্কতা দেওয়া হল।
২৯.৫.২০২১.

No comments:
Post a Comment