আমফান - ফিরে দেখা - Weather of West Bengal

My weather, my bengal.

Thursday, May 20, 2021

আমফান - ফিরে দেখা

Amphan cyclone



  ০ মে ২০২০। তিনটে ২০। এই তারিখটা হয়তো পশ্চিমবঙ্গবাসীর জন্য নতুন করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ঠিক এক বছর আগে এই দিনটাতেই আমরা সম্মুখীন হয়েছিলাম এক অচেনা বিপদ। প্রকৃতির কাছে মানুষ এখনও যে কতটা অসহায়, তা খুব ভালো মতোই টের পেয়েছিল বাঙালি। অনেকের কাছেই সেই রাতের বীভৎস স্মৃতি এখনও ফিকে হয়নি।


  একে করোনার প্রথম ঢেউ, দেশজুড়ে লকডাউন, তার মধ্যে এই অচেনা বিপদ। অন্যান্য দিন তাও হাতে গোনা কিছু মানুষ রাস্তাঘাটে গলার মধ্যে মাস্ক ঝুলিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু সেদিন দুপুর থেকেই কার্যত শুনশান হয়ে পড়ে শহরের রাস্তাঘাট। পুলিশ প্রশাসন বারবার মাইকিং করতে থাকে "ঘর থেকে কেউ বেরোবেন না। ঘূর্ণিঝড় আসছে।" শহর কলকাতার বহু উড়ালপুল, ব্রিজে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। হাওড়া ব্রিজে সেবার প্রথম যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হতে দেখেছিলাম।


আমফান আতঙ্কে তখন সম্পূর্ণ বন্ধ হাওড়া ব্রিজ


  দুপুর থেকে বৃষ্টিও নিজের মর্জি মতো পড়েই চলেছে। কিছুক্ষন পর পর দমকা হাওয়া এসে শহরের বুকের গাছগুলি দুলিয়ে চলেছে। পুরোনো নতুন গাছপালা বহু ঝড় ঝাপটা সহ্য করে এসেছে, কিন্তু তাদের কাছেও এ যেন এক নতুন চ্যালেঞ্জ।


  কংক্রিটের শহর কলকাতা থেকে বেশ কিছু কিলোমিটার দক্ষিণে কিন্তু আগের দিন থেকেই চলছিল যুদ্ধকালীন তৎপরতা। প্রশাসনের কাছে এক চ্যালেঞ্জ ছিল কীভাবে যত সম্ভব মানুকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তাও আবার করোনা পরিস্হিতির মধ্যে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার পাথরপ্রতিমা, নামখানা, কাকদ্বীপ, উত্তর ২৪ পরগণার সন্দেশখালী, হিঙ্গলগঞ্জ প্রভৃতি আয়লা বিধ্বস্ত স্থানের বহু মানুষের ভবিষ্যৎ ঘূর্ণিঝড়ের সুতোয় ঝুলে থাকে। তাদের কাছে ঝড় বড়োই আতঙ্কের। দুপুরের মধ্যেই বহু উপকূলবর্তী গ্রাম খালি করে দেওয়া হয়। প্রায় সকল বাসিন্দাদের নিরাপদে সাইক্লোন সেন্টারে নিয়ে আসতে পেরেছিল প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।


  দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়। ঝড়ের গতিবেগ বাড়তেই থাকে। খবর পাওয়া যায় পাথরপ্রতিমা দিয়ে রাজ্যের ভূমি স্পর্শ করেছেন উনি, আর উনার অভিমুখ এবার উত্তরের দিকে। ইতিমধ্যেই একের পর এক গাছপালা ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র কলকাতা থেকে তখনও প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু তান্ডব দেখে তা বোঝার উপায় নেই। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। আর মাঝে মাঝেই দমকা হাওয়ায় খোলা জায়গায় দাঁড়ানোর উপায়টুকু নেই। বিকাল হতেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বিদ্যুৎ সংযোগ। 


সারি দিয়ে পরপর পড়ে রয়েছে গাছ - আমফানের পরের দিন এটাই ছিল কলকাতার সর্বত্র চিত্র



 আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসতে থাকে। বাইরে তখন রীতিমতো প্রলয় চলছে। মেঘের গর্জন শুনেছি কিন্তু ঝড়ের গর্জন যে কাকে বলে, তা প্রথম জেনেছিলাম ওইদিন। 

 

  বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড়ের একটি লাইন তখন মনে পড়েছিল -

"প্রণাম, হে রুদ্রদেব, প্রণাম। আপনার তান্ডব দেখবার সুযোগ দিয়েচেন, এজন্যে প্রণাম গ্রহণ করুন, হে দেবতা।"

 

  একটা সময়ে বাতাসের চাপ এত কমে যায় যে কানে রীতিমতো ব্যথা শুরু হয়ে যায়। পাহাড়ের অনেক উচ্চতায় উঠলে অনেক সময় এরকম অভিজ্ঞতা হয়। বুঝেছিলাম যে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র বা চোখ অতিক্রম করছে সেই সময়।

 

  একটি ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র বা চোখে বায়ুচাপ সব থেকে কম থাকে। চোখ অতিক্রম করার আগে ও পড়ে বাতাসের অভিমুখ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। যার জন্য সাধারণ ঝড়ের থেকে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। 


  সবার মনে তখন একটাই প্রশ্ন যে কখন শেষ হবে এই ঝড়।  বাইরের কোনো জায়গা থেকে আর খবর  পাওয়া যাচ্ছে না। ইন্টারনেট দূরের কথা, কল করার মতো নেটওয়ার্কও নেই ফোনে। সেদিন প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত তান্ডব চলেছিল। রাতের সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে জলমগ্ন রাস্তা ও তার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে ভাঙা গাছ বা কোথাও পড়ে রয়েছে ল্যাম্পপোস্ট।

 

  আমফানের তাণ্ডবে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছিল রাজ্যের উপকূলবর্তী সকল জেলা। বিশেষ করে দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর। রাজ্যের পেশ করা হিসাব অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে ঝড়ে ২৮,৫৬,০০০ বাড়ি ভেঙে পড়েছিল। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮,৫৬০ কোটি টাকা। মোট ১,৫৮,০০০ হেক্টর জমির বনভূমি নষ্ট হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে দক্ষিণের বহু গ্রামের সাথে বহুদিন যোগাযোগ করা যায়নি।


বাঁধ ভেঙে প্লাবিত গ্রাম


  কলকাতা শহরেই ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ১৩৩ কিলোমিটার। এর থেকেই ধারণা পাওয়া যায় দক্ষিণের অন্যান্য জায়গায় কী পরিমাণ শক্তি নিয়ে আঘাত হেনেছে এই ঝড়। এর পাশাপাশি সেদিন রেকর্ড বৃষ্টিতে ভেসেছিল শহর। ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ২৩৬ মিলিমিটার যা ১৩০ বছরের রেকর্ড। এত সতর্কতা অবলম্বন করার পরেও সেদিন মৃত্যু হয়েছিল ৯৬ জনের। 


  অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় কলকাতায় গাছপালা অনেক বেশি। সেদিন কম করে হাজার চারেক বড় গাছ শহর থেকে উচ্ছেদ করে দিয়ে গেছে আমফান। যেই ক্ষতি কখনোই পূরণ করা যাবে না। বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইলের টাওয়ার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছিল প্রায় এক সপ্তাহ।


শহরের বুকে ভেঙে পড়েছে বহু গাছ


  সেই আমফানের এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার সাগরে নতুন ঘূর্ণিঝড়ের ভ্রুকুটি। এখনও পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় তৈরীর অনুকূল পরিস্হিতি রয়েছে। এই ঝড়ের ভবিষ্যৎ কি হবে তা আগামী ৪৮ ঘন্টায় অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যাবে।  তবে আমফানের মতো এরকম বিপর্যয় যেন আর ফিরে না আসে সেটাই এখন প্রার্থনা রাজ্যবাসীর।


 - দেবজ্যোতি মল্লিক

No comments:

Post a Comment

Weather Prediction Model

Comming Soon......